আঁকিবুকি

খেয়ালী লেখা

অনন্ত গান

leave a comment »

আমার মধ্যে কটা আমি!
হিসেব কষতে বসেই দেখি
থই মেলে না। কোথায় থামি!

 

একটি আমির ভাল লাগে
ভোরের তারা, সাঁঝের বাতি।
অপরটি – সে ভালবাসে
আঁধারঘেরা নিশীথ রাতি।
আলো-আঁধার, কালো-উজল
দুই-ই কি হয় সমান দামী!

 

যে আমিটির মন কেড়েছে
রূপসাগরে মনের মানুষ,
সেই আমিটিই হঠাৎ হাওয়ার
ভাসানস্রোতে ওড়ায় ফানুস।
শিকড় টানে। আকাশ ডাকে।
পথহারা মন মধ্যগামী।

 

একটি আমির গহীন রাতে
একলা ঘরে শ্রান্ত রোদন।
অন্য আমির রোজ প্রভাতে
পূবের আলোয় দিন-আবাহন।
এমনি করেই আলোয়-কালোয়
অতীত হবে দূর আগামী।

Written by মালিনী

নভেম্বর 15, 2009 at 6:51 অপরাহ্ন

লজ্জা

with 2 comments

অবসাদ –
বিষণ্ণ সায়াহ্নের স্বাদ।

 

আলোকলতার পাতা নতমুখী, নিরুপায় রাধা।
কৃষ্ণ মেঘ অবিশ্রাম লালসার্দ্র আশ্লেষের ধারে
নিস্তেজ করেছে তার প্রাণবতী জীবন, যৌবন।

 

নতনেত্র আকাশের অক্ষিপত্রে অনিদ্রার কালো।
চিরপ্রিয়া ধরিত্রীর নগ্ন বক্ষ ব্যথায় আতুর।
হৃতবস্ত্রা নগরীর লজ্জা দেখে কৃষ্ণ গেছে বনে।

 

শুধু কাম, শুধু মোহ, শুধু দেহ, বিষাক্ত নিঃশ্বাস।
অভিমানী যাজ্ঞসেনী হতমানা, নিঃস্ব, নিরাশ্বাস।

 

কৃষ্ণ শুধু কালো? শুধু আদিগন্ত তমসায় লীন?
অপাবৃত হও সখা! প্রতীক্ষায় রাত জাগে দিন।

Written by মালিনী

জুন 27, 2009 at 12:19 পুর্বাহ্ন

বিপ্রলব্ধ

leave a comment »

কত কাল আসনি।
কত দিন অপেক্ষায় আছি।
কত রাত নিদ্রাহীন গেল।

 

সন্ধ্যার সরণি বেয়ে আসবে –
বৃষ্টির বাতাসে তুমি ভাসবে –
আমি তাই নিশ্চুপ বসে থাকি।

 

কাকভোরে কালোর আস্তর ফুঁড়ে
প্রথম আলোর মুখ আকাশের কোণে জেগে ওঠে –
ভাবি – তুমি আসবে।
নবীন ঘাসের গালে শিশিরের সস্নেহ চুম্বনে
সমস্ত প্রান্তর ছেয়ে অপত্যের আহ্লাদী হিল্লোল –
ভাবি – তুমি আসবে।

 

ক্রমশ: আঁধার নামে।
আকাশে সন্ধ্যার দীপ লাজনম্র সুতনুকা যেন
প্রতীক্ষার সঙ্কেতসন্নিভ।
সে আলোয় পথ চিনে
কখন আবার তুমি
আমার দরজার পাশে
লতাপাতা জঞ্জাল সরিয়ে
দাঁড়াবে সুস্মিত –
আমি তারই অপেক্ষায় আছি।

Written by মালিনী

জুন 23, 2009 at 1:23 পুর্বাহ্ন

পড়শি গেছে দেশান্তরে

leave a comment »

রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী। কি তাঁর পরিচয়? কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক? না কি ডালপালামেলা মস্ত এক সংসারের এক সরস মহীরুহ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যাঁর জীবনরস একইভাবে প্রবাহিত ছিল তাঁর শিরা উপশিরা ছাপিয়ে আশপাশের সবার মধ্যে?


অধুনা বাংলাদেশের মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারে ১৯২২ সালে জন্ম হয় কৃষ্ণদাস আচার্য চৌধুরী ও বিভাবতী দেবীর সন্তান রমেন্দ্রকুমারের। শিক্ষা শুরু হয় মুক্তাগাছায়। তারপরে কলকাতায় উচ্চশিক্ষা। ইংরেজীতে এম.এ.কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পান সাহিত্যের এই কৃতী ছাত্র। এরপরে সরকারী কলেজে অধ্যাপনা। তারই পাশাপাশি নিজস্ব পড়াশোনায় ঋদ্ধ হতে থাকে মনন। মক্‌সো করা চলতে থাকে অজস্র কবিতার। শৈলীতে অত্যন্ত আধুনিক এই কবিতাগুচ্ছের ছত্রে ছত্রে কবির শিক্ষার দীপ্তির ঝলক। আহৃত জ্ঞানকে আত্মীকরণ করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া অনায়াস সহজতায়। এখানেই তিনি পৃথক। হয়তো এক নতুন পথেরও পথিকৃৎ। শুধুই ভাবালুতা নয়। শুধুই ‘ফুল খেলবার’ প্রয়াস নয়। তাঁর কবিতার মেরুদন্ড তাঁর প্রজ্ঞা। অনেককাল আগে এক নিতান্ত অর্বাচীন নাতনীকে কবিতার পাঠ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন তাঁর ‘লবণরসে’র প্রতি দুর্বলতার কথা। রসবোধ, বাক্যের বাঁকে বাঁকে উজ্জ্বল মনীষার উপস্থিতি তাঁর সেই লবণরস। কবি বলতেন এ রস তাঁর জন্মসূত্রে পাওয়া। একে তিনি কোন অবস্থায়, কোন পরিস্থিতিতেই ভুলে থাকেননি। প্রতিদিনের টুকরো কথায়, ঘরোয়া আড্ডায়, এমনকি গুরুগম্ভীর সভাতেও বুদ্ধির বিভায় রসময় তাঁর উপস্থিতি।


রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আরশিনগর’ প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাস থেকে। এই গ্রন্থেরই ‘আরশিনগর’ কবিতাটি সসম্মানে স্থান করে নিয়েছে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ শীর্ষক সঙ্কলন গ্রন্থে। এরপরে আসে ‘ব্রহ্ম ও পুঁতির মউরি’ যা তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থের সঙ্কলন। এ ছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে আছে অজস্র কবিতা, প্রবন্ধ। প্রচারবিমুখ কবি সভাসমিতিতে যেতে ভারী অস্বস্তি বোধ করতেন। বরং ‘আরশিনগর’-এর কাছেই অনেক বেশী স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। কেউ তাঁর সেই রত্নাগারের সন্ধান পেলে শিশুর মত অনাবিল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠতেন।


অকালে চলে গেলেন তা হয়তো বলা যাবেনা অঙ্কের হিসেবে। কিন্তু সৃষ্টিশীল যে মানুষটি ব্যাপৃত ছিলেন তাঁর তৃতীয় বইটি শেষ করার কাজে, যাঁর বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি এবং sense of humour শেষ সময় পর্যন্ত ছিল শান দেওয়া ইস্পাতের ফলার মত, যাঁর কাছে আরও অনেক পাওয়ার ছিল, চাওয়ার ছিল অগণিত ছাত্র, বন্ধু, শুভার্থীর, তাঁর প্রয়াণ এত সহজে মেনে নেওয়া শুধু নয়, মনেও নেওয়া যায়না। তবে সুরসিক কবি হয়তো স্বভাবসিদ্ধ মুচকি হাসিতে চোখদুটি উজ্জ্বল করে ভাবছেন, ‘পড়শি আমার উঠলো পন্টিয়াকে’। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন তিনি।

Written by মালিনী

জুন 23, 2009 at 1:03 পুর্বাহ্ন

শঙ্কাতুর

leave a comment »

 

কত কাজ করা হয় না ।
অন্তরমাধুরী বৃথা যায় ।
ভ্রান্তির আশঙ্কায়,
প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয় না ।
অবসাদ প্রাচীরের মত
বহির্বাতাসের পথ রুদ্ধ করে রাখে ।

কত কথা বলা হয় না ।
মাহেন্দ্রমুহূর্ত বৃথা যায় ।
প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কায়,
মন-বাক্যের মেলবন্ধন হয় না ।
একাকীত্ব শাণিত অস্ত্রের মত
শব্দের সংসার ধ্বংস করে ।

কত চোখে চাওয়া হয় না ।
আকুল আহ্বান বৃথা যায় ।
আশাভঙ্গের শঙ্কায়,
নিঃশব্দ দৃষ্টির ভাষা অপঠিত থাকে ।
নিরর্গল অশ্রুর প্লাবন
নিয়ত আশ্রয়চ্যুত করে ।

ভীরু আমি, নিঃস্ব আমি,
বিভ্রান্ত, নিরবলম্ব আমি -
দিনরাত্রি চরাচরে ভাসি ।

 

 


Written by মালিনী

ফেব্রুয়ারি 21, 2009 at 8:17 পুর্বাহ্ন

অবিচলিত

leave a comment »

দিনের কাছে মাথা নোয়াব না ।
ক্ষণোজ্জ্বল বহুরূপী দিন -
তার অনুভাবে বিচলিত হব না ।
তার বর্ণচ্ছটায় পথভ্রষ্ট হব না ।
আমাকে সে চঞ্চল করে ।
অথচ, আমার উদ্বাহু আলিঙ্গনকে তুচ্ছ করে,
আমার আতপ্ত অন্তরকে অবজ্ঞা করে,
আমার সদর অন্দর আঁধার করে -
অনধীন স্বেচ্ছাচারী দিন
ক্রন্দসীর রক্তিম কন্ঠমূলে মুখ ঢাকে ।

রাতের কাছে মাথা নোয়াব না ।
অচঞ্চল অন্ধকার রাত -
তার প্রগাঢ়তায় আশঙ্কিত হব না ।
তার দুর্ভেদ্য বিস্তারে বিহ্বল হব না ।
আমাকে সে অধিকার করে ।
অথচ, আমার আকুল আকাঙ্ক্ষাকে নগ্ন করে,
আমার অনিদ্র প্রতীক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে,
আমার তমসার্দ্র কামনাকে প্রকট করে -
অনিরুদ্ধ আত্মগর্বী রাত
পূষার প্রত্যুষরথে অহনার অনুগামী হয় ।

জীবনের কাছে মাথা নোয়াব না ।
রূপদক্ষ অধ্বগ জীবন -
তার প্রলোভনে দিগ্‌ভ্রান্ত হব না ।
তার মধুচক্রে বিলুপ্ত হব না ।
আমাকে সে আকর্ষণ করে ।
অথচ, নিরায়ুধ আমাকে উপেক্ষা করে,
নিঃসঙ্গ আমাকে নিরাশ্রয় করে,
নিমজ্জমান আমাকে নিরাশ করে -
পরশ্রমজীবী এ জীবন
আমাকে তৃষ্ণার্ত জেনে তবু অভীষ্টপূরণে ব্রতী হয় ।

অভিমানী আমি – চিরাগত মৃত্যুকে ভালবাসবো ।


Written by মালিনী

জানুয়ারি 17, 2009 at 10:03 অপরাহ্ন

প্রত্যাবর্তন

with one comment

 

ও মেয়ে, তোর মুখটি কেন ভার?
চোখটি ছলোছল?
মনপবনের নাও ভাসিয়ে
বইছে নোনা জল !
কেন – আমায় খুলে বল ।

এই তো কেমন হিমেল হাওয়া,
গাছের পাতায় আলো ।
ভোরের সূয্যি ঢেকে দিলেন
রাতকলসের কালো ।
রূপসী দিন প্রেক্ষণিকা,
পূর্ণ ঢলোঢল ।
তবু চোখটি ছলোছল !
কেন – আমায় খুলে বল ।

একদা কাকচক্ষু মনে প্রাত্যহিকের কালি ।
পড়শি গেছে দেশান্তরে, আয়নামহল খালি ।
আঁটকুঠুরি – ঝাঁট পড়ে না – জমছে ধুলোবালি ।

নিকিয়ে নে না উঠোনখানা,
সাজিয়ে নে না ঘর ।
আঁধারজমা আঁটকুঠুরি
আলোয় মেলে ধর ।
অমনি দেখবি বিহানবেলায় ক্রন্দসী যায় ভেসে ।
গহীন রাতে আলাপচারি – পড়শি এল দেশে ।

 

 

Written by মালিনী

জানুয়ারি 2, 2009 at 12:30 পুর্বাহ্ন

প্রান্তলীন

leave a comment »

প্রতিদিন ভাবি – বিষণ্ণ হবো না ।
সদর খিড়কি এঁটে রাখবো ।
সাঁঝবাতি জ্বেলে রাখবো ।
বিষাদের বেনোজলে
নিকনো উঠোন, ঘরবসত ভিজতে দেবো না ।
প্রতিদিন ভাবি ।

প্রতিদিন ভাবি – বিপন্ন হবো না ।
বুকের ধারে বাঁধ বাঁধবো ।
যুক্তিতক্কো শানিয়ে রাখবো ।
কথার মারে
মনপেয়ালায় ঝোড়ো হাওয়া উঠতে দেবো না ।
প্রতিদিন ভাবি ।

প্রতিদিন ভাবি ।
তবু প্রতিদিনই -
ভোর তেতে ওঠে দুপুরে ।
দুপুর তেতে ওঠে রাতে ।
আলো গড়ায় আঁধারে ।
মনের মরা খাতে -
বিষাদ বানভাসি ।
সদর-খিড়কি হাট-কপাট ।
সাঁঝপিদিমে জলের ছাঁট ।
আঁধারভেজা ঘরবসতে -
উদান অট্টহাসি ।

তবু – প্রতিদিন ভাবি ।
 

Written by মালিনী

ডিসেম্বর 24, 2008 at 1:20 অপরাহ্ন

অন্যমনা

leave a comment »

 

 

সে আমাকে প্রতিনিয়ত বলে –

‘আমাকে ভালবাসো ।’
আমি বলি – ‘বাসবো ।’

নিশ্চুপ ভোরে ঘুমভাঙা সূর্যের আলোয় পথ চিনে
সে আসে ।
নিশ্ছিদ্র প্রদোষে একলা তারাকে পথ চিনিয়ে সে আসে ।
বলে – ‘আমাকে ভালবাসো ।’
আমি বলি – ‘বাসবো ।’

আমার দিনযাপনের ছত্রে ছত্রে খেদ ।
আমার মনমহলের স্তরে স্তরে মেদ ।
আমার নিঃঝুম নীড় – দু চোখে নেই আলো ।
আমার ভুবনজোড়া অমানিশার কালো ।

তবু –
বিষণ্ণ বিরত আমাকেই ভালবেসে সে বলে –
‘আমাকে ভালবাসো ।’
আমি বলি – ‘বাসবো ।’

জন্মের ক্রন্দন থেকে মৃত্যুর ক্রন্দনের পথে –
আমার সনিষ্ঠ সঙ্গীর কাছে –
এ আমার অনান্তরিক অঙ্গীকার ।

সে জানে ।
তবু ভালবাসে ।
আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিই ।
বলি – ‘ভালবাসবো ।’
প্রতীক্ষায় রাখি । কিন্তু নিশ্চেষ্ট নির্লিপ্ত একা থাকি ।
সেই ভালবাসে ।
বলে – ‘আমাকে ভালবাসো ।’
আমি বলি – ‘বাসবো ।’

Written by মালিনী

ডিসেম্বর 22, 2008 at 9:50 অপরাহ্ন

সবুজ ডাকে আয়

with one comment

If you are unable to read this Bangla travelogue due to problems with Bangla (Bengali) fonts, please click here for a format which does not require installation of Bangla (Bengali) fonts.


 

এ পথ গেছে কোনখানে...ছোট্ট ছুটির ফাঁদে পা দিয়ে বেরিয়ে পড়ার উপযুক্ত দেশ কর্ণাটক । রাজধানী বেঙ্গালুরু আর রাজ্যপাট ছড়ানো মহীশুরের আশেপাশে আনাচে কানাচে কাবেরী, কাবিনি, কপিলা নদীর ধারে ধারে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে, অরণ্যের অতলে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য । এদের কাছে পৌঁছবার পথটা এদেরই মত চিত্তাকর্ষক । উড়ান নয়, রেলযাত্রা নয় । একেবারে পথটুকু ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলা । এমনি এক গন্তব্য চিকমাগালুর । বাবাবুদান পাহাড়ের গা ঘেঁষে শান্ত শহর চিকামাগালুর – ছোট কন্যের দেশ । রাজার ছোট মেয়ের সম্পত্তি – তাই এই নাম । বেঙ্গালুরু থেকে মাত্র ২৫১ কিলোমিটার দূরে । কি সুন্দর পথ! ভালো লাগলো তো থমকে থেমে নাও খানিক । বাধা নেই । পথের দুধারে নানা রকম সবুজ – গাঢ় – আরও গাঢ় – হালকা – আরও হালকা – একেবারে কচি নতুন পাতার সবুজ – পান্নার পথ সত্যিই । কালো তিরতিরে পথটি – এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে । এদিক, ওদিক ছড়ানো ছেটানো একহারা খামারবাড়ি, গির্জা, মন্দির, মসজিদ, মানুষের বসতি, ছোট ছোট দোকান । দোকানিদের হাসিমুখ । বেসাতির ফাঁকে ফাঁকে ঘরগেরস্থালির খবর দেওয়া নেওয়া । এ এক জীবন। আমাদের জীবন থেকে কত ভিন্ন এর সুর ! এদের দেখলে মনে হয় না তো জীবনে কোথাও কিছু কম পড়েছে ! প্রাচুর্য নেই, কিন্তু প্রশান্তির অভাব নেই চোখে মুখে । অকৃপণ প্রকৃতির মাঝখানে বাস বলেই কি এত পূর্ণতার ঔজ্জ্বল্য? আমাদের নগরজীবনের কয়েদখানায় এ পূর্ণতার ছবি নিয়ত চোখে পড়ে না তো ! সে যাক্‌, ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে পথ তো থামে অবশেষে । পথ না পথিক ! পথের নাকি শেষ নেই ! অস্থায়ী আস্তানা খুঁজে খুঁজে যেখানে পৌঁছয় ক্লান্ত পথিক – সে জায়গাটি মন জুড়ানো, চোখ জুড়ানো। তাজ গার্ডেন রিট্রিট । পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আরামের আশ্বাস । ছিমছাম নির্জন ঘরের লাগোয়া ছোট্ট চিলতে বারান্দা । তার থেকে এক ধাপ নিচেই সবুজ গালিচা । ঘরের মেয়ে লজ্জাবতী যেমন আছে সেখানে, তেমনি আছে বাহারি ফুল নানা রঙের । আর আছে ছোট ছোট পাখি । এ গাছ থেকে ও গাছ তাদের নিরন্তর ছোটাছুটি । আসা যাওয়ার পথে স্থবির গাছগুলির বুকে দোল দিয়ে যায় । বারান্দার দেওয়ালে বড় গাছের ছায়া কাঁপে তিরতির । আর আলোয় ছায়ায় কত না ছবি আঁকা হয় প্রতি মুহূর্তে ! খাবার ঘরের পাশে গোলপাতা ঝুপসি গাছটায় বাস করে এক গিরগিটি । মানুষকে তার ভয় যত, দেখার শখও তার চেয়ে কিছু কম নয় । ঘরগুলির মাঝখানে সাঁতারপুকুরের নীল জল টলটল । তার পাশে বসে নতুন জ্যোৎস্না আর পাহাড়ি বাতাস গায়ে মেখে শহুরে মন জুড়োয় ।

 

 

পান্নার পথএরপর পথ চলে উপরপানে । এবারে সে পাকদণ্ডী । ঘুরে ঘুরে বনের মধ্য দিয়ে, কচিপাতার সঙ্গে সখ্য পাতিয়ে, এলাচঝোপকে দুলিয়ে দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয় । কেম্মনগুণ্ডি । চিকমাগালুরের ৫৫ কিলোমিটার উত্তরে । বাবাবুদান পাহাড়ে ১৪৩৪ মিটার উচ্চতায় সুন্দর পাহাড়ি শহর । পাহাড়ের মাথায় কৃত্রিম সমতল ফুলে ফুলে ভরা । সেখানেও আস্তানার আশ্বাস । সরকারি ব্যবস্থাপনা । এছাড়াও আছে “Nature Nirvana” । এখান থেকে যতদূর চোখ যায় – শুধু সবুজ । আর সবুজের ফাঁকে ফাঁকে প্রকৃতির ভালবাসার ছোঁয়া । কোথাও তার আদরের রঙ গাঢ় লাল, কোথাও ফিকে বেগ্‌নি, কোথাও হালকা গোলাপি, আবার কোথাও ঝলমলে হলুদ । মনের বিস্তার বাড়ে এ উদারতার সামনে । এ শুধু দিয়ে যাওয়া । প্রতিদানের প্রত্যাশা নেই ।

 

চিকমাগালুর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কর্ণাটকের সর্বোচ্চ পাহারচূড়া – মুল্লায়নগিরি । ৬০০০ ফিটেরও বেশী উচ্চতায় সূর্যাস্ত মনকাড়া ।

 

দত্তাত্রেয় পীঠ- বাবাবুদান গিরিচূড়ায় আরেকটি আকর্ষণ । প্রকৃতির তৈরী এক গুহায় মানুষের ভালবাসার, শ্রদ্ধার, সমর্পণের তীর্থ দত্তাত্রেয় পীঠ। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায় পবিত্র মানেন এই তীর্থকে । সুফি সন্ত বাবাবুদানই দত্তাত্রেয় নামেও পরিচিত ছিলেন – এমনটাই শোনা যায় । গুহার অভ্যন্তরে একপাশে হিন্দুর তীর্থ, অন্যপাশে মুসলমানের । চিকমাগালুর থেকে ৩২ কিলোমিটার এর দূরত্ব । এদেশের লোক বলেন বাবাবুদান ষোড়শ শতাব্দীতে সাতটি কফির বীজ এনেছিলেন পশ্চিম এশিয়া থেকে । তাঁর রোপণ করা সেই সাতটি বীজ ভারতবর্ষে কফির স্বাদ পৌঁছে দেয় ।

 

তীর্থদর্শন করে ফিরে চলা চিকমাগালুর । সবুজের দেশ চিকমাগালুর । সুন্দরের দেশ চিকমাগালুর । শান্ত এই সুন্দরের পায়ের কাছে দাঁড়ালে ঘরবসতের চিন্তা, ভয়ভাবনা, দুঃখ, রাগ, বিদ্বেষ মুহূর্তে উধাও । মন বলে – “হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে, যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে … ।”

 

 

আকাশ নতুন, বাতাস নতুন

পথের হদিশ:

কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরু আসা যায় ট্রেনে কিম্বা উড়ানে । বেঙ্গালুরু পৌঁছে খোঁজ নিতে হবে ট্যাক্সি কিম্বা সরকারি / বেসরকারি বাসের । শহর থেকে চিকমাগালুর পৌঁছনো যায় ৫-৫১/২ ঘন্টায় । তাজে অগ্রিম জানিয়ে ঘর নির্দিষ্ট করে রাখা প্রয়োজন, যেহেতু অন্য আশ্রয়ের আশ্বাস নেই । 

 

Written by মালিনী

জুন 8, 2008 at 1:02 পুর্বাহ্ন

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.