আঁকিবুকি

খেয়ালী লেখা

সবুজ ডাকে আয় জুলাই 8, 2008

যার অধীনে আছে: Article, bangla, bengali, ভ্রমণ — মালিনী @ 1:02 am
Tags: , , , , ,

If you are unable to read this Bangla travelogue due to problems with Bangla (Bengali) fonts, please click here for a format which does not require installation of Bangla (Bengali) fonts.


 

এ পথ গেছে কোনখানে...ছোট্ট ছুটির ফাঁদে পা দিয়ে বেরিয়ে পড়ার উপযুক্ত দেশ কর্ণাটক । রাজধানী বেঙ্গালুরু আর রাজ্যপাট ছড়ানো মহীশুরের আশেপাশে আনাচে কানাচে কাবেরী, কাবিনি, কপিলা নদীর ধারে ধারে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে, অরণ্যের অতলে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য । এদের কাছে পৌঁছবার পথটা এদেরই মত চিত্তাকর্ষক । উড়ান নয়, রেলযাত্রা নয় । একেবারে পথটুকু ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলা । এমনি এক গন্তব্য চিকমাগালুর । বাবাবুদান পাহাড়ের গা ঘেঁষে শান্ত শহর চিকামাগালুর – ছোট কন্যের দেশ । রাজার ছোট মেয়ের সম্পত্তি – তাই এই নাম । বেঙ্গালুরু থেকে মাত্র ২৫১ কিলোমিটার দূরে । কি সুন্দর পথ! ভালো লাগলো তো থমকে থেমে নাও খানিক । বাধা নেই । পথের দুধারে নানা রকম সবুজ – গাঢ় – আরও গাঢ় – হালকা – আরও হালকা – একেবারে কচি নতুন পাতার সবুজ – পান্নার পথ সত্যিই । কালো তিরতিরে পথটি – এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে । এদিক, ওদিক ছড়ানো ছেটানো একহারা খামারবাড়ি, গির্জা, মন্দির, মসজিদ, মানুষের বসতি, ছোট ছোট দোকান । দোকানিদের হাসিমুখ । বেসাতির ফাঁকে ফাঁকে ঘরগেরস্থালির খবর দেওয়া নেওয়া । এ এক জীবন। আমাদের জীবন থেকে কত ভিন্ন এর সুর ! এদের দেখলে মনে হয় না তো জীবনে কোথাও কিছু কম পড়েছে ! প্রাচুর্য নেই, কিন্তু প্রশান্তির অভাব নেই চোখে মুখে । অকৃপণ প্রকৃতির মাঝখানে বাস বলেই কি এত পূর্ণতার ঔজ্জ্বল্য? আমাদের নগরজীবনের কয়েদখানায় এ পূর্ণতার ছবি নিয়ত চোখে পড়ে না তো ! সে যাক্‌, ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে পথ তো থামে অবশেষে । পথ না পথিক ! পথের নাকি শেষ নেই ! অস্থায়ী আস্তানা খুঁজে খুঁজে যেখানে পৌঁছয় ক্লান্ত পথিক – সে জায়গাটি মন জুড়ানো, চোখ জুড়ানো। তাজ গার্ডেন রিট্রিট । পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আরামের আশ্বাস । ছিমছাম নির্জন ঘরের লাগোয়া ছোট্ট চিলতে বারান্দা । তার থেকে এক ধাপ নিচেই সবুজ গালিচা । ঘরের মেয়ে লজ্জাবতী যেমন আছে সেখানে, তেমনি আছে বাহারি ফুল নানা রঙের । আর আছে ছোট ছোট পাখি । এ গাছ থেকে ও গাছ তাদের নিরন্তর ছোটাছুটি । আসা যাওয়ার পথে স্থবির গাছগুলির বুকে দোল দিয়ে যায় । বারান্দার দেওয়ালে বড় গাছের ছায়া কাঁপে তিরতির । আর আলোয় ছায়ায় কত না ছবি আঁকা হয় প্রতি মুহূর্তে ! খাবার ঘরের পাশে গোলপাতা ঝুপসি গাছটায় বাস করে এক গিরগিটি । মানুষকে তার ভয় যত, দেখার শখও তার চেয়ে কিছু কম নয় । ঘরগুলির মাঝখানে সাঁতারপুকুরের নীল জল টলটল । তার পাশে বসে নতুন জ্যোৎস্না আর পাহাড়ি বাতাস গায়ে মেখে শহুরে মন জুড়োয় ।

 

 

পান্নার পথএরপর পথ চলে উপরপানে । এবারে সে পাকদণ্ডী । ঘুরে ঘুরে বনের মধ্য দিয়ে, কচিপাতার সঙ্গে সখ্য পাতিয়ে, এলাচঝোপকে দুলিয়ে দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয় । কেম্মনগুণ্ডি । চিকমাগালুরের ৫৫ কিলোমিটার উত্তরে । বাবাবুদান পাহাড়ে ১৪৩৪ মিটার উচ্চতায় সুন্দর পাহাড়ি শহর । পাহাড়ের মাথায় কৃত্রিম সমতল ফুলে ফুলে ভরা । সেখানেও আস্তানার আশ্বাস । সরকারি ব্যবস্থাপনা । এছাড়াও আছে “Nature Nirvana” । এখান থেকে যতদূর চোখ যায় – শুধু সবুজ । আর সবুজের ফাঁকে ফাঁকে প্রকৃতির ভালবাসার ছোঁয়া । কোথাও তার আদরের রঙ গাঢ় লাল, কোথাও ফিকে বেগ্‌নি, কোথাও হালকা গোলাপি, আবার কোথাও ঝলমলে হলুদ । মনের বিস্তার বাড়ে এ উদারতার সামনে । এ শুধু দিয়ে যাওয়া । প্রতিদানের প্রত্যাশা নেই ।

 

চিকমাগালুর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কর্ণাটকের সর্বোচ্চ পাহারচূড়া – মুল্লায়নগিরি । ৬০০০ ফিটেরও বেশী উচ্চতায় সূর্যাস্ত মনকাড়া ।

 

দত্তাত্রেয় পীঠ- বাবাবুদান গিরিচূড়ায় আরেকটি আকর্ষণ । প্রকৃতির তৈরী এক গুহায় মানুষের ভালবাসার, শ্রদ্ধার, সমর্পণের তীর্থ দত্তাত্রেয় পীঠ। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায় পবিত্র মানেন এই তীর্থকে । সুফি সন্ত বাবাবুদানই দত্তাত্রেয় নামেও পরিচিত ছিলেন – এমনটাই শোনা যায় । গুহার অভ্যন্তরে একপাশে হিন্দুর তীর্থ, অন্যপাশে মুসলমানের । চিকমাগালুর থেকে ৩২ কিলোমিটার এর দূরত্ব । এদেশের লোক বলেন বাবাবুদান ষোড়শ শতাব্দীতে সাতটি কফির বীজ এনেছিলেন পশ্চিম এশিয়া থেকে । তাঁর রোপণ করা সেই সাতটি বীজ ভারতবর্ষে কফির স্বাদ পৌঁছে দেয় ।

 

তীর্থদর্শন করে ফিরে চলা চিকমাগালুর । সবুজের দেশ চিকমাগালুর । সুন্দরের দেশ চিকমাগালুর । শান্ত এই সুন্দরের পায়ের কাছে দাঁড়ালে ঘরবসতের চিন্তা, ভয়ভাবনা, দুঃখ, রাগ, বিদ্বেষ মুহূর্তে উধাও । মন বলে – “হে পূর্ণ, তব চরণের কাছে, যাহা-কিছু সব আছে আছে আছে … ।”

 

 

আকাশ নতুন, বাতাস নতুন

পথের হদিশ:

কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরু আসা যায় ট্রেনে কিম্বা উড়ানে । বেঙ্গালুরু পৌঁছে খোঁজ নিতে হবে ট্যাক্সি কিম্বা সরকারি / বেসরকারি বাসের । শহর থেকে চিকমাগালুর পৌঁছনো যায় ৫-৫১/২ ঘন্টায় । তাজে অগ্রিম জানিয়ে ঘর নির্দিষ্ট করে রাখা প্রয়োজন, যেহেতু অন্য আশ্রয়ের আশ্বাস নেই । 

 

 

One Response to “সবুজ ডাকে আয়”

  1. এত স্পষ্ট সাবলীল লেখা বহুদিন পড়িনি। ভ্রমণ কাহিনী খুব কম লেখকের হাতে সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে। খুব কম সংখ্যক লেখা আছে যা নিছক ভ্রমণকাহিনীতে পর্যবসিত হয় না। নিজের সীমানাকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে অন্যকিছু। এরকম লেখা হিসেবে আপনার এই লেখাটিকেও আমি স্বীকৃতি দিতে চাই।
    ভাল লেখার জন্য ধন্যবাদ


Leave a Reply