রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী। কি তাঁর পরিচয়? কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক? না কি ডালপালামেলা মস্ত এক সংসারের এক সরস মহীরুহ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যাঁর জীবনরস একইভাবে প্রবাহিত ছিল তাঁর শিরা উপশিরা ছাপিয়ে আশপাশের সবার মধ্যে?
অধুনা বাংলাদেশের মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারে ১৯২২ সালে জন্ম হয় কৃষ্ণদাস আচার্য চৌধুরী ও বিভাবতী দেবীর সন্তান রমেন্দ্রকুমারের। শিক্ষা শুরু হয় মুক্তাগাছায়। তারপরে কলকাতায় উচ্চশিক্ষা। ইংরেজীতে এম.এ.কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পান সাহিত্যের এই কৃতী ছাত্র। এরপরে সরকারী কলেজে অধ্যাপনা। তারই পাশাপাশি নিজস্ব পড়াশোনায় ঋদ্ধ হতে থাকে মনন। মক্সো করা চলতে থাকে অজস্র কবিতার। শৈলীতে অত্যন্ত আধুনিক এই কবিতাগুচ্ছের ছত্রে ছত্রে কবির শিক্ষার দীপ্তির ঝলক। আহৃত জ্ঞানকে আত্মীকরণ করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া অনায়াস সহজতায়। এখানেই তিনি পৃথক। হয়তো এক নতুন পথেরও পথিকৃৎ। শুধুই ভাবালুতা নয়। শুধুই ‘ফুল খেলবার’ প্রয়াস নয়। তাঁর কবিতার মেরুদন্ড তাঁর প্রজ্ঞা। অনেককাল আগে এক নিতান্ত অর্বাচীন নাতনীকে কবিতার পাঠ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন তাঁর ‘লবণরসে’র প্রতি দুর্বলতার কথা। রসবোধ, বাক্যের বাঁকে বাঁকে উজ্জ্বল মনীষার উপস্থিতি তাঁর সেই লবণরস। কবি বলতেন এ রস তাঁর জন্মসূত্রে পাওয়া। একে তিনি কোন অবস্থায়, কোন পরিস্থিতিতেই ভুলে থাকেননি। প্রতিদিনের টুকরো কথায়, ঘরোয়া আড্ডায়, এমনকি গুরুগম্ভীর সভাতেও বুদ্ধির বিভায় রসময় তাঁর উপস্থিতি।
রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আরশিনগর’ প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাস থেকে। এই গ্রন্থেরই ‘আরশিনগর’ কবিতাটি সসম্মানে স্থান করে নিয়েছে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ শীর্ষক সঙ্কলন গ্রন্থে। এরপরে আসে ‘ব্রহ্ম ও পুঁতির মউরি’ যা তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থের সঙ্কলন। এ ছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে আছে অজস্র কবিতা, প্রবন্ধ। প্রচারবিমুখ কবি সভাসমিতিতে যেতে ভারী অস্বস্তি বোধ করতেন। বরং ‘আরশিনগর’-এর কাছেই অনেক বেশী স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। কেউ তাঁর সেই রত্নাগারের সন্ধান পেলে শিশুর মত অনাবিল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠতেন।
অকালে চলে গেলেন তা হয়তো বলা যাবেনা অঙ্কের হিসেবে। কিন্তু সৃষ্টিশীল যে মানুষটি ব্যাপৃত ছিলেন তাঁর তৃতীয় বইটি শেষ করার কাজে, যাঁর বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি এবং sense of humour শেষ সময় পর্যন্ত ছিল শান দেওয়া ইস্পাতের ফলার মত, যাঁর কাছে আরও অনেক পাওয়ার ছিল, চাওয়ার ছিল অগণিত ছাত্র, বন্ধু, শুভার্থীর, তাঁর প্রয়াণ এত সহজে মেনে নেওয়া শুধু নয়, মনেও নেওয়া যায়না। তবে সুরসিক কবি হয়তো স্বভাবসিদ্ধ মুচকি হাসিতে চোখদুটি উজ্জ্বল করে ভাবছেন, ‘পড়শি আমার উঠলো পন্টিয়াকে’। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন তিনি।